Shankha Seashell Art of Domkal এ যেন এক রূপকথার গ্রাম। গ্রামে ঢুকতেই আপনাকে স্বাগত জানাবে সামুদ্রিক নোনা বাতাস। যদিও সমুদ্র নেই আশেপাশে কোথাও। আপনি অবাক হবেন। এ কিরম গন্ধ! তখনই আপনি দেখবেন রাস্তার পাশে কোনও এক শঙ্খ শিল্পালয় বা শাঁখার দোকান। আরও ভিতরে গেলে দেখবেন চারিদিকে উড়ছে শাদা ধুলো। পরে বুঝবেন ধুলো না আসলে শঙ্খের শাদা গুড়ো। ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।
খাতায় কলমে এ যদিও গ্রাম নয়, ডোমকল পৌরসভার আট নম্বর ওয়ার্ড। ডোমকল পৌরসভায় রূপায়িত হয়েছে ২০১৮ সালে। একুশটি ওয়ার্ডের পৌরসভায় আট নম্বর ওয়ার্ডে এই লক্ষ্মীনাথপুর গ্রাম। গ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বাস। আর গ্রামের সিংহভাগ মানুষই শঙ্খ শিল্পের সাথে যুক্ত। এই এলাকার মানুষের শঙ্খের কাজের ইতিহাস শতাব্দী প্রাচীন। এলাকার প্রবীণদের কাছে শোনা যায়, এই শঙ্খ শিল্পের কাজের ধারা পাঁচশো বছরেরও প্রাচীন।
Shankha Seashell Art of Domkal ডোমকলে শঙ্খের গ্রাম – আরও দেখুনঃ https://www.youtube.com/watch?v=D-xL9736Z_A&t=433s
কালের নিয়মে কাজের ধারাও বদলেছে। তবে বদলায়নি ঐতিহ্য। এই গ্রামে আজও শঙ্খ ও শাঁখার কাজই মানুষের মূল পেশা। শঙ্খ, শাঁখার সাথে হিন্দু ধর্মের মানুষের যোগ অঙ্গাঙ্গিক। আজও বাংলার ঘরে সন্ধ্যায় যে শঙ্খধ্বনি বাজে অথবা যে শাদা শাঁখা পরে হিন্দু মেয়েরা বিয়ের আসরে বসেন, তা এই শঙ্খ শিল্পীদেরই হাতে তৈরি। যুগ যুগ ধরে এই পেশায় নিযুক্ত লোকেদের বলা হয় ‘শাঁখারি’। শাঁখারির পেশা প্রাচীন। পূর্বে হাতে শাঁখা বানিয়ে সেই শাঁখা নিয়ে ফেরি করে হিন্দুদের বাড়ির অন্দরমহলে পৌঁছে যেতেন শাঁখারিরা। নিজে হাতে করে মা, বউদের হাতে পড়িয়ে দিতেন শাঁখা। তবে আজ কাজের ধারা বদলেছে। আজ শাঁখারিরা শুধুই শাঁখা বানিয়ে ফেরি করেন না। গ্রাম থেকে পাইকারী শাঁখা, শঙ্খ পৌঁছে যায় রাজ্য তথা দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এখন এসেছে আধুনিক মেশিনও। গ্রামে রয়েছে মহাজন। মহাজনের বাড়িতে রয়েছে বিভিন্ন কাজের মেশিন। আর সেখানেই গড়ে উঠেছে আস্ত কারখানা। গ্রামের প্রায় প্রতি ঘরেই রয়েছে ছোট বড় কারখানা। পঁচিশ, তিরিশজন শঙ্খ শিল্পী সকাল থেকে শুরু করে বেলা পর্যন্ত কাজ করেন সেখানেই।
‘শঙ্খ’ হল শামুকের মতোই একপ্রকার সামুদ্রিক জীব। যা সামুদ্রিক এলাকা থেকে আমদানি হয় এই গ্রামে। মূলত, চেন্নাই সহ দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন জায়গা থেকে আমদানি করে নিয়ে আসা হয় বস্তা বন্দি শঙ্খের মৃতদেহ। দাক্ষিণাত্যে বিভিন্ন মহাজনদের থেকে শঙ্খ আসে ডোমকলে। প্রথমে শঙ্খকে পরিস্কার করে ধোয়া হয়। খোলসের ভিতর থেকে বের করা হয়, পচে যাওয়া দেহের অংশ। তারপর আবার ধুয়ে শুরু হয় শঙ্খের খোলস ঘষা, মাজা ও কাটা, সব শেষে নক্সার কাজ। সারাদিন ধরে নানান ভাগে কাজ চলে। গ্রামের প্রতিটি ঘরেই হয় এই সামুদ্রিক প্রানীর খোলসের কাজ। আর তাই পুরো গ্রামের বাতাসে মিশে সামুদ্রিক নোনা গন্ধ।
ডোমকলের লক্ষীনাথপুরের বাসিন্দারা বংশানুক্রমে করে আসছে এই শঙ্খ শিল্পের কাজ। একটা বড় মাপের শঙ্খ কেটে দশ জোড়া শাঁখা তৈরি হয়। আর ছোট শঙ্খ হলে তা থেকে পাঁচ, ছয় জোড়া শাঁখা। মহাজনদের থেকে প্রতি পিস হিসাবে শঙ্খ কিনে এনে শুরু হয় কাজ। আকার অনুযায়ী দাম ঠিক হয় শঙ্খের। এখন গ্রামে মেশিন এসেছে ফলে, বেড়েছে কাজের গতি। একজন শিল্পী দিনে দুশো থেকে পাঁচশো জোড়া শাঁখা বানাতে পারেন। এক জোড়া শাঁখা বানানোর জন্য সর্ব নিম্ন পাঁচ টাকা মজুরি পান শিল্পীরা। কাজের নক্সা অনুযায়ী বাড়ে মজুরিও। এলাকার প্রবীণ শঙ্খ শিল্পী সুব্রত পাল। শঙ্খের কাজ করে জীবনের অর্ধেক সময় পার করেছেন তিনি। নিজে মুখেই বলেন, তাঁর হাতের একজোড়া শাঁখার মজুরি সর্বোচ্চ দুহাজার টাকাও দাম উঠেছে। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে শাঁখা তৈরির কাজ করছেন এই প্রবীণ শিল্পী। আরও এক পরিচয় আছে প্রবীণ শঙ্খ শিল্পী সুব্রত পালের। তিনি ডোমকলের লক্ষ্মীনাথপুর পোস্টঅফিসের পোস্টমাস্টার। আজ আর চিঠিপত্রের বালাই নেই। অফিসের কাজের চাপ কম তাই পোস্ট অফিসে বসেই ফাঁকা সময়ে চলে হাতের কাজ। শাঁখার কাজের জন্য পেয়েছেন একাধিক সম্মানও। দেখালেন সেইসব শংসাপত্র। হাতের কাজের ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক কারুশিল্প প্রতিযোগিতায় পেয়েছেন বিশেষ পুরস্কারও। কলকাতায় দিয়ে সেসব পুরস্কার নিয়ে এসেছেন তৎকালীন মন্ত্রী প্রলয় তালুকদারের হাত থেকে। শোনালেন সেই সব সোনালি দিনের কথাও।
প্রবীণদের পাশাপাশি এই এলাকার নবীনরাও হাত লাগিয়েছেন শঙ্খ বা শাঁখা তৈরির কাজে। নবীন শঙ্খ শিল্পী ঋজু পাল বলেন, “পড়াশোনা শেষ করেছি, তবে কাজ করতে বা টাকা কামানোর জন্য বাইরে যাবার ইচ্ছে কোনও দিনও ছিল না। আমাদের নিজেদের গ্রামেই তো কাজের ভালো পরিবেশ। আর ছোট থেকে নিজেদের বাপ ঠাকুরদাকে দেখে এই কাজের প্রতি আগ্রহ জন্মেছে। তাই এই কাজ করার ইচ্ছে ছিল ছোট থেকেই। এখন বাড়ির বড়োদেরও বয়স হয়েছে, তাই আমরাও পড়াশোনা শেষ করে এই কাজেই হাত দিয়েছি। কাজ জানি, কাজ করতেও ভালো লাগে। আর এই কাজ করে যা ইনকাম হয় তাতে চলেও যায়। শাঁখার কাজ আমাদের গ্রামের ঐতিহ্য। তাই এই কাজ ছেড়ে অন্য কাজ করার কথা ভাবিও না।”